নয়টিই কেন, আর ‘গ্রহ’ কেন
গ্রহ শব্দের অর্থ ‘যা গ্রহণ করে’ বা ‘যা আঁকড়ে ধরে’। জ্যোতিষে গ্রহ হল আকাশের চলমান বিন্দু, যারা আমাদের মনকে আঁকড়ে ধরে এবং সময়ের প্রকৃতি গড়ে দেয় বলে মনে করা হয়। গ্রহ নয়টি: সূর্য থেকে শনি পর্যন্ত সাতটি দৃশ্যমান জ্যোতিষ্ক এবং রাহু ও কেতু নামে দুটি ছায়াবিন্দু।
ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো শাস্ত্রীয় পদ্ধতির অংশ নয়। পরাশরী জ্যোতিষ এই নয়টি গ্রহ নিয়েই সম্পূর্ণভাবে কাজ করে।
সাতটি দৃশ্যমান গ্রহ
- সূর্য: আত্মা, প্রাণশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও জীবনের লক্ষ্যবোধের প্রতীক। পিতা, কর্তৃত্ব ও সরকারের সঙ্গে যুক্ত। সিংহ রাশির অধিপতি।
- চন্দ্র: মন, আবেগ, স্মৃতি ও স্বস্তির প্রতীক। মা, পুষ্টি ও জনসাধারণের সঙ্গে যুক্ত। কর্কট রাশির অধিপতি। চন্দ্র সবচেয়ে দ্রুত চলে বলে সময় বিচারে এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- মঙ্গল: শক্তি, সাহস, উদ্যম ও কাজ করার ক্ষমতার প্রতীক। ভাইবোন, জমি ও প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। মেষ ও বৃশ্চিক রাশির অধিপতি।
- বুধ: বুদ্ধি, বাকশক্তি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও রসবোধের প্রতীক। বন্ধু, লেখালেখি ও হিসাবের সঙ্গে যুক্ত। মিথুন ও কন্যা রাশির অধিপতি।
- গুরু বা বৃহস্পতি: জ্ঞান, শিক্ষক, বিশ্বাস, সন্তান ও উন্নতির প্রতীক। প্রথাগতভাবে প্রধান শুভগ্রহ। ধনু ও মীন রাশির অধিপতি।
- শুক্র: প্রেম, সৌন্দর্য, শিল্প, আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের কারক। দাম্পত্য, সংগীত ও রুচিশীল জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। বৃষ ও তুলা রাশির অধিপতি।
- শনি: সময়, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, কর্তব্য ও কঠোর পরিশ্রমের কারক। সেবা, বার্ধক্য ও দীর্ঘস্থায়ী ফলের সঙ্গে যুক্ত। মকর ও কুম্ভ রাশির অধিপতি।
দুটি ছায়াগ্রহ
রাহু ও কেতু কোনো ভৌত জ্যোতিষ্ক নয়। এরা সেই দুটি বিন্দু, যেখানে চাঁদের কক্ষপথ সূর্যের আপাতপথকে ছেদ করে; জ্যোতির্বিজ্ঞানে এদের উত্তর ও দক্ষিণ চন্দ্রপাত বলা হয়। গ্রহণ এদের কাছাকাছি ঘটে, তাই প্রথাগত জ্যোতিষে এদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরা সবসময় পরস্পরের ঠিক মুখোমুখি থাকে এবং রাশিচক্রে উল্টো দিকে চলে।
- রাহু: আকাঙ্ক্ষা, উচ্চাশা, নতুন ও প্রচলিত রীতির বাইরে থাকা বিষয়, বিদেশ এবং আকস্মিক পরিবর্তনের কারক। যে বিষয়কে স্পর্শ করে, রাহু তার প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।
- কেতু: বৈরাগ্য, অন্তর্দৃষ্টি, আধ্যাত্মিকতা ও আসক্তি ত্যাগের প্রতীক। কেতু তীক্ষ্ণ অন্তর্জ্ঞান এবং ‘আগেও যেন এখানে ছিলাম’—এমন অনুভূতি দিতে পারে।
শুভ ও অশুভ গ্রহ—সহজভাবে
শাস্ত্রে বৃহস্পতি, শুক্র, শুক্লপক্ষের চাঁদ এবং শুভ অবস্থানে থাকা বুধকে স্বাভাবিক শুভগ্রহ বলা হয়। অন্যদিকে শনি, মঙ্গল, সূর্য, রাহু ও কেতুকে বলা হয় স্বাভাবিক অশুভগ্রহ। এই শব্দগুলি শুনে ভয় লাগতে পারে, কিন্তু এগুলি আসলে গ্রহের কাজের ধরন বোঝায়। ‘অশুভ’ গ্রহ প্রায়ই পরিশ্রম, চাপ বা বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি করে—আর এমন পরিস্থিতিতেই মানুষ শক্তি ও দক্ষতা গড়ে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই শনিকে ভয় পান। অথচ শক্তিশালী অবস্থানে থাকা শনিই স্থির কর্মজীবন, ধৈর্য ও পরিশ্রমে অর্জিত সম্মানের কারক। কোনো গ্রহই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়। আপনার ছকে তার রাশি, ভাব, বল এবং অন্য গ্রহের সঙ্গে সম্পর্কই ঠিক করে দেয় গ্রহটি কেমন ফল দেবে।
মিত্র ও শত্রু
প্রতিটি গ্রহের স্বাভাবিক মিত্র, সম এবং শত্রু রয়েছে। সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল ও বৃহস্পতি সাধারণত একে অপরকে সমর্থন করে; বুধ, শুক্র ও শনি আরেকটি মিত্রগোষ্ঠী গঠন করে। কোনো নির্দিষ্ট রাশিতে একটি গ্রহ কতটা স্বচ্ছন্দ, তা বিচার করতে এই সম্পর্কগুলি জ্যোতিষীকে সাহায্য করে।
গ্রহ তার উচ্চ রাশিতে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নীচ রাশিতে সবচেয়ে দুর্বল থাকে। সূর্য মেষে, চন্দ্র বৃষে, মঙ্গল মকরে, বুধ কন্যায়, বৃহস্পতি কর্কটে, শুক্র মীনে এবং শনি তুলায় উচ্চস্থ। প্রত্যেক গ্রহই তার উচ্চ রাশির ঠিক বিপরীত রাশিতে নীচস্থ হয়।
নিজের নয়টি গ্রহ দেখুন
আপনার জন্মছকে দেখা যায়, জন্মের সময় নয়টি গ্রহের প্রত্যেকটি কোথায় ছিল। কুণ্ডলী পাতায় প্রতিটি গ্রহের রাশি, ভাব ও অংশ দেওয়া থাকে; কোনো গ্রহ বক্রী থাকলে সেটিও উল্লেখ করা হয়।